• চর্যাপদে ধর্মীয় তত্ত্ব, বাঙালি জীবনের আচার-আচরণ এবং সমাজের বিভিন্ন বাস্তবধর্মী চিত্রের উল্লেখ রয়েছে।
চর্যাপদের মধ্যে উল্লেখিত বিষয়গুলি নিম্নরূপ:
১. ধর্মীয় তত্ত্ব:
চর্যাপদে তান্ত্রিক ও সহজযান ধর্মের বিভিন্ন তত্ত্বের আলোচনা রয়েছে। পদগুলোতে সাধনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ধর্মীয় দর্শনকে তুলে ধরা হয়েছে, যা সাধকদের আত্মিক উন্নতির দিকে নির্দেশ করে।
২. বাঙালি জীবনের আচার-আচরণ:
চর্যাপদে বাঙালি জীবনের বিভিন্ন আচার-আচরণের চিত্র পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, বিয়ে, শিকার, নৌকা চালনা, ঢাক-ঢোল বাজিয়ে অনুষ্ঠান ইত্যাদির উল্লেখ রয়েছে।
৩. সমাজের আচার-আচরণ:
চর্যাপদে তৎকালীন বাঙালি সমাজের সামাজিক আচরণের চিত্রও প্রতিফলিত হয়েছে। এতে স্থানীয় রীতি-নীতি, সংস্কৃতি এবং সামাজিক জীবনধারার বর্ণনা রয়েছে, যেমন মেয়েদের পরিধানে ময়ূরপুচ্ছের ব্যবহার।
----------------------------
চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রথম আবিষ্কার করেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে নেপাল রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে। শাস্ত্রীর সম্পাদনায় ১৯১৬ সালে এটি "বৌদ্ধগান ও দোহা" নামে প্রকাশিত হয়।
চর্যাপদের মূল বৈশিষ্ট্য:
সংকলন ও নাম: এই গ্রন্থটি ৪৭টি পদ নিয়ে গঠিত এবং এর পদগুলোকে ‘চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়’ নামেও ডাকা হয়। তবে এটি 'বৌদ্ধগান ও দোহা' বা 'চর্যাপদ' নামেই বেশি পরিচিত।
পদকর্তারা: ২৩ জন সিদ্ধাচার্য (পদকর্তা) চর্যাপদ রচনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে সরহপা, শবরপা, লুইপা, কাহ্নপা, ডোম্বীপা প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বিষয়বস্তু ও ভাষার বৈশিষ্ট্য:
সহজযান ও তন্ত্রবাদ: চর্যাকাররা সহজযান ধর্মমতে দীক্ষিত ছিলেন, যা তান্ত্রিক যোগসাধনার একটি বিশেষ শাখা। তাঁদের পদগুলোতে সাধনামূলক তত্ত্ব ও ধর্মীয় দর্শন হেঁয়ালিপূর্ণ ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে। পণ্ডিতরা এই ভাষাকে ‘আলো-আঁধারি’ বা ‘সন্ধ্যা ভাষা’ নামে অভিহিত করেছেন।
ভাষা: চর্যাপদের ভাষা অবিমিশ্র বাংলা নয়। এতে বাংলা, উড়িয়া, অসমিয়া ভাষার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এটি বাংলা ভাষার প্রাচীনতম রূপের নিদর্শন হলেও বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণ রয়েছে।
সাহিত্য ও সঙ্গীতমূল্য:
গান ও সুর: প্রতিটি পদ রাগ ও তাল অনুসারে গাওয়া হতো, যা থেকে বোঝা যায় এটি প্রাচীন বাংলা গানের একটি নিদর্শন। পদের শেষে ‘ধ্রুব’ শব্দের উল্লেখ আছে, যা পদগুলির গীতধর্মিতার প্রমাণ দেয়।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র:
• চর্যাপদে তৎকালীন বাঙালি সমাজের বিভিন্ন বাস্তবধর্মী চিত্রও পাওয়া যায়। হরিণ শিকার, নৌকা চালনা, শুঁড়ির কাজ, ঢাক-ঢোল বাজিয়ে বিয়ে, এবং মেয়েদের পরিধানে ময়ূরপুচ্ছের ব্যবহার ইত্যাদি সমাজের আচার-আচরণের পরিচয় বহন করে।
এ ছাড়া পদগুলি থেকে তৎকালীন বাঙালি জীবনের আচার-আচরণ ও সমাজের বাস্তবঘন পরিচয়ও পাওয়া যায়।
চর্যাপদ তাই কেবল আধ্যাত্মিক সাধনা ও তত্ত্বের গ্রন্থ নয়, এটি প্রাচীন বাংলার সাহিত্য, সংগীত ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল।
উৎস: বাংলাপিডিয়া ও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা, ড. সৌমিত্র শেখর।